শুটকি মহালের নারী শ্রমিকের ভাগ্যে জুটে বৈষম্য আর বঞ্চনা

রির্পোটার:
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : বুধবার, মে ১, ২০১৯
  • 274 বার সংবাদটি পড়া হয়েছে

আজিম নিহাদ :
ভোরে অন্ধকার ভেদ করে সূর্য আলো ছড়ানোর আগেই শুটকি মহালে জেবুন্নেছা বেগমের (৪৫) জীবিকার সংগ্রাম শুরু হয়। সন্ধ্যা গড়িয়ে অন্ধকার নেমে আসা পর্যন্ত থামে না জেবুন্নেছার কাজ। প্রতিদিন ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা পরিশ্রম করেও যথাযথ মজুরি পান না তিনি। তার ভাগ্যে জুটে শুধু বৈষম্য আর বঞ্চনা।
জেবুন্নেছা কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক শুটকি মহালে দিনমজুরির কাজ করে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের সবচেয়ে বৃহৎ শুটকি মহাল নাজিরারটেক। জেবুন্নেছার মত ৫ থেকে ৭ হাজার নারী শ্রমিক সেখানে কাজ করে। এসব নারী শ্রমিকেরা প্রতিদিন ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা কাজ করেও দৈনিক মজুরি পান মাত্র ৩০০ টাকা।
শুটকি মহাল সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নাজিরারটেকে প্রায় চার শতাধিক শুটকি মহাল রয়েছে। শুটকি মহালে পুরুষের চেয়ে নারী শ্রমিকদের কাজ বেশি। তাই নারী শ্রমিকের সংখ্যাও বেশি। মাছ বাছাই করা, ধোঁয়া, শুকাতে দেওয়া, শুকানোর পর রপ্তানী প্রক্রিয়াজাত করাসহ বিভিন্ন কাজ করে থাকে নারীরা। ক্ষেত্রবিশেষে পুরুষের চেয়ে কাজ বেশি করলেও নারী শ্রমিকদের বেতনের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য করা হয়।
মহাল মালিকেরা জানান, শুটকি মহালে যেসব পুরুষ শ্রমিক কাজ করে তাদের সাথে ৯ মাসের জন্য ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকায় চুক্তি হয়। আর নারী শ্রমিকদের দৈনিক মজুরিতে রাখা হয়। নারী শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হয় দৈনিক ৩০০ টাকা। এক বছর আগেও নারী শ্রমিকদের বেতন ছিল মাত্র ২০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা।
মঙ্গলবার দুপুরে নাজিরারটেকে শামীম আহম্মেদ নামে এক ব্যবসায়ীর মহালে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন নারী শ্রমিক প্রখর রোদের মধ্যেও মাছ শুকানোর কাজ করছেন। নারীদের সাথে পুরুষ শ্রমিকদেরও কাজ করতে দেখা যায়। গরমে তারা হাঁপিয়ে উঠেছেন। তবুও বিশ্রাম নেওয়ার ফুরসত নেই তাদের।
সেখানে কথা হয় নারী শ্রমিক ইসমত আরা বেগমের (৪২) সাথে। গত তিন বছর ধরে তিনি শুটকি মহালে কাজ করছেন। তার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অচল। তার সাথে এখন বাকপ্রতিবন্ধি মেয়েও সেখানে দিনমজুরির কাজ করে। ইসতম আরা বেগম বলেন, এখানে সারাদিন কাজ করে বেতন পায় ৩০০ টাকা। সেই টাকা দিয়ে কোন রকম খেয়ে-পরে জীবন চলে। এখন পেটের তাগিদে বাধ্য হয়ে বাকপ্রতিবন্ধি মেয়েও কাজ করে।
তিনি আরও বলেন, পুরুষদের চেয়ে আমরা কোন অংশে কম পরিশ্রম করি না, কিন্তু বেতনের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকার হয়। সারাদিন নোংরা পরিবেশে কাজ করে অসুস্থ হয়ে গেলে চিকিৎসা করার মত সামর্থও থাকে না। তাই তিনি নারী শ্রমিকদের যথাযথ বেতন দেয়ার দাবী জানান।
শুটকি মহালের মালিক শাহেদুল ইসলাম বলেন, নারী শ্রমিকদের বেতন আগে আরও কম ছিল। এখন কিছুটা বেড়েছে। বৈষম্য যেটা হচ্ছে সেটা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এটার সমাধান করতে হলে সবার ঐক্যমত দরকার।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কক্সবাজার শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমান সময়ে এসে নারীদের বেতন বৈষম্য কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মের প্রতি নারীদের আগ্রহ বেশি এবং উৎপাদনমুখিতাও পুরুষের চেয়ে বেশি। তারা কাজে ফাঁকি দেয় না। তাই তাদের পারিশ্রমিক নিয়ে বৈষম্য করা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, মে দিবস মানে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের একটি দিন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শ্রমিকদের অধিকার বাস্তবায়নের পরিবেশ বাংলাদেশে প্রেক্ষাপটে দেখা মিলে না। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে আরও বেশি। তাই দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শ্রমিকদের কল্যাণে কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়া জরুরি

নিউজটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই বিষয়ে আরো সংবাদ দেখুন
© All rights reserved © 2021 cox71.com
Developed by WebArt IT