মুসলিম সংখ্যা গরিষ্টতা কমাতে কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিল করেছে মোদি সরকার

রির্পোটার:
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : বুধবার, আগস্ট ৭, ২০১৯
  • 107 বার সংবাদটি পড়া হয়েছে

কক্সঃ৭১ রিপোর্ট

কাশ্মীরিদের রক্ষাকবচ সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫-এ ধারা এক ঝটকায় বিলুপ্ত করে দেওয়ার পর উত্তর-পূর্ব ভারতে ভাঙন আতঙ্ক শুরু হয়েছে। কারণ সংবিধানের ৩৭১-এ ও ৩৭১-জি ধারা অনুযায়ী, উত্তর-পূর্ব ভারতের জনগণ বিভিন্ন ধরনের সংরক্ষণের সুবিধা পান। ভারতের সংবিধানে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের যে নিশ্চয়তা ছিল তা বাতিল হওয়ার ফলে এখন থেকে যে কেউ চাইলেও কাশ্মীরে সম্পদের মালিক হতে পারবে।
৩৫-এ ধারা অনুযায়ী, এত দিন কাশ্মীরের বাসিন্দা নন এমন ভারতীয়দের সেখানে সম্পদের মালিক হওয়া ও চাকরি পাওয়ায় বাধা ছিল। মোদি সরকারের সিদ্ধান্তে সেই বাধা দূর হয়েছে। এখন চাইলেই যেকোনো ভারতীয় নাগরিক সেখান ভূমিসহ অন্যান্য সম্পদ কিনতে পারবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অনুচ্ছেদে বর্ণিত কাশ্মীরিদের বিশেষ সুবিধা অকার্যকর করার মধ্য দিয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক চরিত্রে পরিবর্তন আনতে চাইছে বিজেপি।
মোদি সরকার আদতে কাশ্মীরে হিন্দু বসতি ও শিল্প গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়কে হুমকির মুখে ঠেলে দিতে চাইছে। এই সিদ্ধান্তকে তাই অনেকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের প্রশ্ন ইসরায়েলি নীতির সঙ্গে তুলনা করছেন। তাদের মতে, কাশ্মীরকে ফিলিস্তিন বানানোর পাঁয়তারা করছে হিন্দুত্ববাদী সরকার।
ভারতীয় সংবিধানের ধর্মীয়, সামাজিক কোনো ধারা উত্তর-পূর্ব ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে কার্যকর নয়। সেখানে দেশীয় আইন, ঐতিহ্য অনুযায়ী অনেক কিছু নিয়ন্ত্রিত হয়। সম্পত্তি ও জমির হস্তান্তরও হয় নিজস্ব নিয়মে। এমনকি পার্বত্য এলাকায় জমির ওপরে ও নিচে থাকা বন বা খনিজ সম্পদের ওপরেও অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অধিকার স্বীকৃত। দিতে হয় না কোনো কর।
৩৭০ ধারা বাতিল নিয়ে মিজোরামের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা লালথানহাওলা বলেন, এ ঘটনা মিজোরাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল প্রদেশের মতো রাজ্যের পক্ষে আতঙ্কের। কংগ্রেস মুখপাত্র লাল লিয়াংচুঙ্গা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ৩৭১-এ ধারায় হাত পড়লে রুখে দাঁড়াবে মিজোরা। অধিকার রক্ষায় আমরা মরতেও প্রস্তুত। নাগাল্যান্ডের বৃহত্তম জনজাতি মঞ্চ নাগা হো হো-র সভাপতি চুবা ওঝুকুমের ৩৭০ ধারা নিয়ে মোদি সরকারের সিদ্ধান্তকে অগণতান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে বলেন, আমরাও অধিকার হারানোর আশঙ্কায় ভুগছি।
সংবিধানের ৩৬৮ ধারার ভিত্তিতে ৩৭১ নম্বর ধারায় নয়টি রাজ্যকে বেশ কিছু বিশেষ সুবিধা ও অধিকার দেওয়া হয়েছে। মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও অন্ধ্রপ্রদেশও রয়েছে সেই তালিকায়। ৩৭১-বি ধারায় রয়েছে আসামের কথা। ওই ধারায় বর্ণিত অধিকার বলে রাজ্যপালকে আসামের জনজাতি এলাকার প্রতিনিধিদের নিয়ে বিধানসভার কমিটি গঠনের অধিকার দিতে পারেন রাষ্ট্রপতি। এ ছাড়াও আছে ২৪৪-এ ধারা। ১৯৬৯ সালে যোগ করা এই ধারায় আসামকে স্বশাসিত পরিষদ গঠনের বিশেষ অধিকার দেওয়া হয়েছে। ৩৭১-ডি ও ই ধারায় অন্ধ্রপ্রদেশে শিক্ষা ও চাকরিতে সংরক্ষণসহ কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে রাষ্ট্রপতির হাতে। অরুণাচল প্রদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ অধিকার দেওয়া রয়েছে রাজ্যপালকে। তিনি নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন ৩৭১-এইচ ধারার ভিত্তিতে।
৩৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে থাকা ৩৫-এ অনুচ্ছেদে বর্ণিত বিশেষ অধিকারের বদৌলতে এত দিন ভূস্বর্গ বলে পরিচিত কাশ্মীরে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীদের জমি বা সম্পত্তি কিনতে পারত না। সেখানকার সব ধরনের সরকারি চাকরি বা ট্রেড লাইসেন্স বরাদ্দ ছিল রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য। কাদের স্থায়ী বাসিন্দা বলা হবে, সেই সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষমতাও ছিল রাজ্য বিধানসভার হাতেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাধারণত এমন সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য রাজ্যের স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতার প্রয়োজন হয়। তবে জম্মু-কাশ্মীরে এখন কেন্দ্রীয় শাসন চলছে। গত জুনে মেহবুবা মুফতির পিডিসি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার থেকে নিজেদের সমর্থন প্রত্যাহার করে বিজেপি। তখনই রাজ্যটি সরাসরি কেন্দ্রের শাসনাধীন হয়।
জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হ্যাপিমন জ্যাকব সিএনএনকে বলেন, কেন্দ্রীয় শাসন জারির মধ্য দিয়েই জম্মু-কাশ্মীরের সুরক্ষাকবচ হিসেবে থাকা ৩৭০ ধারা বাতিলের পথ করে নিয়েছে বিজেপি সরকার। তবে যেভাবে প্রেসিডেন্সিয়াল ডিক্রির মধ্য দিয়ে ৩৭০ ধারা বিলোপ করা হয়েছে, তার আইনত ভিত্তি দুর্বল। আদালতে এই আদেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। যদিও বিজেপি সেটা নিয়ে মোটেই চিন্তিত নয় বলেই মনে হচ্ছে। তারা যেনতেনভাবে এই সিদ্ধান্ত বহাল রাখবে এবং এই বাস্তবতা দীর্ঘ হবে। দীর্ঘ সময়কে কাজে লাগিয়ে বিজেপি রাজ্যটাকে ব্যাপকভাবে বদলে ফেলার চেষ্টা করবে। বর্তমানে সেখানে আইনত কোনো বিরোধী নেই। গভর্নর এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতার এখতিয়ার রাখেন। তবে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিয়োজিত।
ভারতীয় বিধি অনুযায়ী, স্থানীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারই গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃপক্ষীয় ভূমিকা পালন করার এখতিয়ারভুক্ত। তবে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে কেন্দ্রীয় সরকারই শাসনব্যবস্থার মূল নিয়ন্ত্রক। জ্যাকবের মতে, একটি রাজ্যকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করার দৃষ্টান্ত নজিরবিহীন। তবে জম্মু-কাশ্মীরের রাজনীতির আমূল ও মৌলিক পরিবর্তন সত্যিই বিস্ময়কর। কারণ একবার একটি রাজ্য কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হলে সেখানকার রাজ্যসভার আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে না।
বিজেপির এক নির্বাচনী পোস্টার ছিল ‘আপকা সাহি ভোট কাশ্মীরমে আপকো প্লট দিলা সাকতা হ্যায়’। এর অর্থ হলো, আপনি যদি ঠিকমতো ভোট দিয়ে (বিজেপিকে) জেতান, তাহলে কাশ্মীরে জমি কেনার স্বপ্নও আপনার সফল হবে। বিশেষ মর্যাদা বিলুপ্ত হওয়ার পর এখন ভারতের অন্য এলাকার নাগরিকরাও কাশ্মীরে জমি-বাড়ি কিনতে পারবেন। ইচ্ছে করলে টাটা বা বিড়লা শিল্পগোষ্ঠী জমি কিনে সেখানে কারখানাও গড়তে পারবে।
লন্ডনভিত্তিক জাস্টিস ফাউন্ডেশনের কর্ণধার অধ্যাপক শল বলেন, ৩৭০ ধারা বিলোপের আগেই আঁচ করা যাচ্ছিল বিজেপি সরকার কাশ্মীরের আবহমানকালের চরিত্রটা পাল্টে দিতে চাইছে। প্রথমত ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল কাশ্মীরের জন্য যে ‘ডোভাল ডকট্রিন’ প্রণয়ন করেছিলেন, তার একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে লোকজনকে কাশ্মীরে স্থানান্তর। সেই ডকট্রিনে কাশ্মীরে হিন্দু পণ্ডিতদের জন্য আলাদা কলোনি স্থাপন, শিল্পাঞ্চলের জন্য বাকি ভারত থেকে শিল্পশ্রমিকদের এনে বসতি স্থাপন কিংবা ভারতীয় সেনার সাবেক সদস্যদের এনে জমি দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, কাশ্মীরিদের একটা বড় অংশ মনে করছে, মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত বিদ্যমান জনমিতির সুরক্ষাকে হুমকির মুখে ফেলবে। কাশ্মীরের বিদ্যমান ভূমির মালিকানা নীতি সেখানকার উন্নয়নের পথে যে প্রতিবন্ধকতা আকারে হাজির ছিল, বিশেষ অধিকার বাতিলের মধ্য দিয়ে সেই পথ প্রশস্ত হবে বলে মনে করেন মোদি সরকার। তবে লস অ্যাঞ্জেলস টাইমসে বলা হয়েছে, বিশেষ অধিকার বাতিল হলে তুষারে আচ্ছাদিত ভূস্বর্গে হিন্দু সেটেলারদের বসতি গড়ার পথ প্রশস্ত হবে, হ্রাস পাবে মুসলিম জনসংখ্যা। একে ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইহুদি বসতি স্থাপনের অন্যায্যতার সঙ্গে তুলনা করছেন অনেক বিশ্লেষক। মুসাদির আমিন নামের কাশ্মীরভিত্তিক একজন বিশ্লেষক বলেন, মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য কাশ্মীরের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক অবস্থাকে বদলে দেওয়ার প্রচেষ্টা যা কেবল সংঘাতকেই ত্বরান্বিত করবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই বিষয়ে আরো সংবাদ দেখুন
© All rights reserved © 2021 cox71.com
Developed by WebArt IT